সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সংখ্যালঘু দ্রুজদের সহিংস সংঘাত আবারও আলোচনায় এনেছে এই ছোট কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়টিকে।
লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, ইসরায়েল ও ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমিজুড়ে ছড়িয়ে আছে এই সম্প্রদায়। তাদেরকে রক্ষা করার কথা বলেই এ সপ্তাহে সিরিয়ার ইসলামিক-নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুইদা শহরে গত সপ্তাহে দ্রুজ ও বেদুইন উপজাতিদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিরিয়ার সরকার সেখানে সেনা পাঠালে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সহিংসতার মধ্যেই সুইদায় দ্রুজদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেয় ইসরায়েল। তারা সিরিয়ার সামরিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয়েও হামলা চালায় এবং দ্রুজদের রক্ষার অঙ্গীকার করে।
দ্রুজ কারা?
আরব জাতিগোষ্ঠীর হলেও দ্রুজরা অনুসরণ করে ইসলামের শাখা থেকে উদ্ভূত এক ধর্মবিশ্বাস, যা ১১ শতকে গড়ে উঠেছিল। দ্রুজদের ধর্মবিশ্বাস শিয়া ইসলামের একটি শাখা হলেও এতে রয়েছে নিজস্ব পরিচয় ও বিশ্বাস।
এতে ইসলাম ছাড়াও নানা দর্শনের সংমিশ্রণ রয়েছে; ধর্মবিশ্বাসে রয়েছে একেশ্বরবাদ, পুনর্জন্ম ও সত্যের অনুসন্ধানের ওপর জোর। এই ধর্মীয় বিশ্বাসের আচার-অনুষ্ঠান তারা গোপনে পালন করে।
কিছু কট্টর সুন্নি গোষ্ঠী তাদের ধর্মদ্রোহী বলে মনে করে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা, যিনি এক সময় জঙ্গি গোষ্ঠী আল কায়েদার সদস্য ছিলেন; তিনি বলেছেন, দ্রুজরা সিরিয়ার গঠনেরই অংশ। তাদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন।
দ্রুজরা কোথায় থাকে?
সিরিয়ায় মূলত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জর্ডান সীমান্তবর্তী সুইদা ও অধিকৃত গোলানের কুনেইত্রা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বাস। তাছাড়া রাজধানী দামেস্কের শহরতলি জারামানায় বাস করে দ্রুজরা।
ইসরায়েলে দ্রুজরা মূলত দেশের উত্তরাঞ্চল এবং অধিকৃত গোলানে বাস করে। লেবাননে দ্রুজরা চুফ, আলেই ও দক্ষিণের হাসবায়ার মতো পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।
ওদিকে, সিরিয়ায় থাকে আনুমানিক প্রায় ১০ লাখ দ্রুজ। তারা সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ।
ইসরায়েলে বাস করা দ্রুজরা বেশিরভাগই ইসরায়েল রাষ্ট্রের অনুগত বলেই মনে করা হয়। সেখানে দ্রুজদের অনেকে সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা ইসরায়েল-সমর্থক হিসেবে গণ্য হন।
ইসরায়েলের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েল ও গোলান মালভূমিতে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার দ্রুজ বাস করে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে দ্রুজরা কীভাবে ভূমিকা রাখে?
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হলেও দ্রুজরা যেসব দেশে থাকে, সেইসব দেশের রাজনীতিতে প্রায়ই বড় ধরনের ভূমিকা রেখে আসছে।
ইসরায়েলে দ্রুজ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। তারা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের মতো নয়। বরং ইসরায়েলের অনেক আরব দ্রুজ দেশটির সামরিক বাহিনী ও পুলিশে কাজ করেন।
কেউ কেউ গাজা যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন এবং উচ্চ পদেও পৌঁছেছেন। ফলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে তাদের কণ্ঠ উপেক্ষা করা কঠিন।
ইসরায়েলে বাস করা বেশিরভাগ দ্রুজ নিজেদেরকে ইসরায়েলি নাগরিক বলেই পরিচয় দেয়। আবার অধিকৃত গোলান মালভূমিতে বাস করা ২০ হাজারের বেশি দ্রুজ এখনও নিজেদের সিরীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেয় এবং সীমান্তের ওপারের আত্মীয়দের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ইসরায়েলি দ্রুজদের কাছ থেকে সিরীয় দ্রুজদের রক্ষা করার আহ্বানের মুখেই ইসরায়েলের নেতারা তাদেরকে রক্ষা করার কারণ দেখিয়ে এবছর বারবার সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছেন।
সিরিয়ায় দ্রুজ সম্প্রদায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর সময় বিক্ষোভে অংশ নিলেও সরকার তাদের সঙ্গে তেমন সংঘাতে জড়ায়নি।
তবে গতবছর ডিসেম্বরে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটির ইসলামপন্থি সরকার ও দ্রুজদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে।
দ্রুজ নেতাদের কেউ কেউ দামেস্ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতার আহ্বান জানালেও অন্যান্যরা আহমদ আর-শারা সরকারের প্রবল বিরোধিতা করছে।
বিশেষত দ্রুজ নেতা শেইখ হিকমত আল-হাজারি এ সপ্তাহে সহিংসতা চলার সময় সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ বিশ্ব নেতাদের কাছেও দ্রুজদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন জানান।
তবে এই অবস্থান সব দ্রুজ সমর্থন করেননি। লেবাননের প্রভাবশালী দ্রুজ রাজনৈতিক নেতা ওয়ালিদ জুমব্লাত ইসরায়েলের ‘দ্রুজদের রক্ষা’র দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নয়, বরং সিরিয়ায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
ইসরায়েল হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত হল কেন?
বাশার আল-আসাদ সরকারের আমলেই ইরান ও তেহরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ঠেকাতে সিরিয়ায় একাধিকবার বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এখন সিরিয়ার নতুন ইসলামপন্থি সরকারকে ‘জিহাদি হুমকি’ হিসাবে দেখছে ইসরায়েল।
তারা দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসলামপন্থি বাহিনী মোতায়েন হতে দেবে না বলেই জানিয়েছে। ইসরায়েল বলছে, সীমান্তে কোনওরকম বৈরি বা শত্রুতামূলক তৎপরতা তারা এড়াতে চায়। একইসঙ্গে তারা দ্রুজদেরকেও রক্ষার অঙ্গীকার করেছে।
এসব কারণ দেখিয়েই ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে। গত ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভুমি সংলগ্ন সিরিয়ার কিছু অঞ্চলও দখলে নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট শারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিরীয় জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, “ইসরায়েল আমাদের জনগণের ঐক্য ধ্বংসের চেষ্টা করছে। আগের সরকারের পতনের পর থেকেই তারা বারবার আমাদের স্থিতিশীলতাকে নস্যাৎ করা এবং আমাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছে।”