PR সিস্টেম নিয়ে যারা বিশাল বিশাল মন্তব্য করছেন, তাদের কথা শুনে আমার সন্দেহ হয় তারা আদৌ এই বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন কি না! এটা দুই দিকেই প্রযোজ্য। প্রথমত, PR সিস্টেমকে আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত FPTP-এর মতো কোনো সিস্টেম ধরে নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় ভুল। পিআর পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রতিটি দেশে ভিন্নভাবে হয়েছে, এবং দেশগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পিআর সিস্টেমকে সাজিয়ে নিয়েছে।
আরও একটু স্পষ্টভাবে বললে, পিআর বলতে অনেকেই মনে করেন যে ভোট হবে, এবং পুরো দেশের ভোট একত্রে যোগ করে (সারা
দেশকে একটি নির্বাচনী এলাকা ধরে) যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে দল তত শতাংশ আসন পাবে। বাস্তবে এই পদ্ধতি — অর্থাৎ পুরো দেশে একটি জাতীয় লিস্ট — কেবল নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইসরাইলসহ কয়েকটি দেশে প্রচলিত। যদিও এখানেও ফলাফল গণনার পদ্ধতি ভিন্ন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পিআর আসনবণ্টন জেলা বা প্রদেশভিত্তিক হয়। যেমন ধরুন, তুরস্কে পিআরের আসনবণ্টন জেলা-ভিত্তিক হয়ে থাকে। জাতীয়ভাবে অন্তত ৭% (আগে ছিল ১০%) ভোট পেলে কেবল জেলা-ভিত্তিক ফলাফলে আসন পাওয়া যায়। সেখানে জেলার জনসংখ্যা অনুসারে ১ টি থেকে ৩৫টি পর্যন্ত আসন রয়েছে। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট D’Hondt পদ্ধতিতে গণনা করে আসন বণ্টন নির্ধারণ করা হয়। এতে এমপিরা জেলা-ভিত্তিকভাবে সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করেন। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের আইন বিভাগে জেলার যথোপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব করেন। জেলার উন্নয়ন নীতিমালার পর্যায়ে তারা মন্ত্রণালয়গুলোতে লবিং করেন এবং সংসদে জেলার স্বার্থে কথা বলেন। বাস্তবায়নটি স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার করে থাকে।
আবারো বলছি, জেলা বা প্রদেশভিত্তিক পিআর পদ্ধতিই বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে প্রচলিত। যেমন — জার্মানি, স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি। প্রায় ৭০-৮০ টি দেশে এরকম জেলা/ প্রদেশ/ অঞ্চলভিত্তিক পিআর পদ্ধতি রয়েছে।
আবার পিআরে আরো নানা সিস্টেমের বাস্তবায়ন আছে যেমন, কিছু কিছু দেশে মিক্সড সিস্টেম প্রযোজ্য। এখানে দল এবং প্রার্থীকেও ভোট দেওয়া হয়।
এখন আসি, পিআরে ভোট গণনার পদ্ধতি নিয়ে। এখানেও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান। অনেকেই সরলীকরণ করে বলেন “যত পার্সেন্ট ভোট, তত পার্সেন্ট আসন” — বাস্তবে কিন্তু প্রায় কোথাও একেবারে সরাসরি এমন থাকে না। উদাহরণস্বরূপ:

D’Hondt পদ্ধতি
দলগুলোর ভোট 1, 2, 3… দিয়ে ভাগ করে
সবচেয়ে বড় ভাগফলগুলোর ভিত্তিতে আসন বণ্টন
(স্পেন, তুরস্ক, বেলজিয়াম ইত্যাদিতে প্রচলিত)

Sainte-Laguë পদ্ধতি
D’Hondt-এর মতো, কিন্তু ভাগের হার 1, 3, 5, 7…
ছোট দলগুলোর প্রতি কিছুটা বেশি সহনশীল
(নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ডের কিছু অংশে ব্যবহৃত)

Hare quota + Largest Remainder
প্রথমে কোটা অনুযায়ী প্রাথমিক আসন বণ্টন
পরে বাকি আসনগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় রিমেইনডার ভিত্তিক বণ্টন

Droop quota (STV ভোটে)
একধরনের কোটা পদ্ধতি, একাধিক প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়
এগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা একটি পোস্টে কঠিন, কারণ দেশগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী এইসব পদ্ধতির মধ্য থেকে একটি বেছে নিয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, পিআর পদ্ধতিতে স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম ভোটের একটি হার ঠিক করা হয়। বেশির ভাগ দেশে এটি ৩–৫%, তুরস্কে কিছুটা বেশি — বর্তমানে ৭% (আগে ১০%)।
সবমিলে পিআর কোনো একক সিস্টেম নয়। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পিআর সিস্টেমকে ভিন্নভাবে সাজিয়ে নিয়েছে।
আমাদের দেশে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থা ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। তাই এমন কোনো সিস্টেমে যাওয়ার চিন্তা আমাদের করা উচিত, যেখানে অনেক দল সংসদে প্রবেশ করবে এবং একক দলের কর্তৃত্ব কমবে। আমরা চাইনা, কেবল ৪০% ভোট পেয়েই দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি পাক এবং ইচ্ছামত সংবিধান সংশোধন করুক। যেমনটা: আওয়ামীলীগ করেছে।
সূত্র:হাফিজুর রহমান